উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কি সরিষার তেল খাওয়া যায়? জানুন সঠিক তথ্য

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে খাঁটি সরিষার তেল খাওয়া যায়। 

সরিষার তেলে থাকা ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি এসিড এবং মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট (MUFA) রক্তনালীর নমনীয়তা বাড়াতে এবং খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে, যা পরোক্ষভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে উপকারী। তবে বাজারে থাকা যেকোনো তেল কেনার আগে সরিষার তেলের দাম এবং এর গুণগত মান যাচাই করা জরুরি, কারণ অতিরিক্ত বা ভেজাল তেল হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আমাদের অনেকের মনেই একটি সাধারণ প্রশ্ন ঘোরে – “রক্ত চাপ বেশি থাকলে কি সরিষার তেল খাওয়া যাবে, নাকি সয়াবিন বা রাইস ব্র্যান অয়েল বেছে নিতে হবে?” 

একটু ভাবলেই বোঝা যায়, আমাদের দাদি-নানিরা কিন্তু আজীবন এই সরিষার তেল দিয়েই রান্না করে এসেছেন। 

কিন্তু আধুনিক সময়ে এসে হার্ট ও প্রেশারের রোগীদের জন্য তেল ব্যবহারের নিয়ম কিছুটা বদলেছে। আসুন খুব সহজ ভাষায় বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিষয়টি বিস্তারিত বুঝে নিই।

উচ্চ রক্তচাপ ও সরিষার তেল: আসল সম্পর্কটি কী?

পরিমিত পরিমাণে খাঁটি সরিষার তেল রক্তচাপের রোগীদের জন্য নিরাপদ এবং উপকারী।

উচ্চ রক্তচাপ থাকলে রক্তনালীগুলো শক্ত হয়ে যায়, ফলে হার্টকে শরীরজুড়ে রক্ত পাম্প করতে বেশি কষ্ট করতে হয়। 

সরিষার তেল এই ক্ষেত্রে একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।হার্ভার্ড স্কুল অব মেডিসিন এবং এইমস (AIIMS)-এর একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, রান্নায় নিয়মিত খাঁটি সরিষার তেল ব্যবহার করলে হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায় ৭০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

নিচে সরিষার তেলের প্রধান উপাদানগুলোর একটি সহজ তালিকা দেওয়া হলো, যা আমাদের হার্টকে ভালো রাখে:

  • ভালো চর্বি বা MUFA: সরিষার তেলে প্রচুর পরিমাণে মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড থাকে, যা ধমনীতে জমে থাকা চর্বি পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
  • ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ এর ভারসাম্য: এটি রক্তনালীর ভেতরের প্রদাহ বা জ্বালাপোড়া কমায়।
  • উচ্চ স্মোক পয়েন্ট: এই তেল খুব বেশি তাপমাত্রাতেও (প্রায় ২৫০° সেলসিয়াস) নষ্ট হয়ে ক্ষতিকর উপাদান তৈরি করে না, তাই আমাদের দেশীয় রান্নার জন্য এটি বেশ নিরাপদ।

সরিষার তেল কীভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে?

এটি রক্তনালীকে নরম রাখে এবং রক্ত চলাচল সহজ করে।

সহজ কথায়, আমাদের রক্তনালীগুলোকে যদি পানির পাইপের সাথে তুলনা করি, তবে পাইপের ভেতর ময়লা জমলে পানির গতি কমে যায় এবং চাপ বাড়ে। 

সরিষার তেল রক্তনালীর ভেতরের সেই “ময়লা” বা খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে সাহায্য করে এবং ভালো কোলেস্টেরল (HDL) বাড়ায়।

মেডিকেল নিউজ টুডে (Medical News Today)-এর একটি পুষ্টি প্রতিবেদনে সরিষার তেলের চর্বির অনুপাতটি এভাবে দেখানো হয়েছে:

চর্বির প্রকারভেদ (প্রতি ১০০ গ্রামে)পরিমাণ (গ্রাম)শরীরের ওপর প্রভাব
মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট (MUFA)৫৯.২ গ্রামরক্তচাপ কমায় ও হার্ট ভালো রাখে
পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট (PUFA)২১.২ গ্রামরক্তের প্রবাহ সচল রাখে
স্যাচুরেটেড ফ্যাট (খারাপ চর্বি)১১.৬ গ্রামখুবই কম পরিমাণ, তাই নিরাপদ

রান্নায় তেলের ব্যবহার: সয়াবিন বনাম সরিষার তেল

হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ সরিষার তেল সয়াবিনের চেয়ে এগিয়ে।

আমাদের দেশে সয়াবিন তেলের ব্যবহার অনেক বেশি। কিন্তু সয়াবিন তেল অতিরিক্ত রিফাইন বা পরিশোধনের মধ্য দিয়ে যায়, যার ফলে এর প্রাকৃতিক গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। 

অন্য দিকে, সরিষার তেল যদি কোল্ড প্রেস বা ঘানি ভাঙা পদ্ধতিতে তৈরি হয়, তবে এর সব পুষ্টি উপাদান অক্ষুন্ন থাকে।

সরিষার তেলে আলফা-লিনোলেনিক এসিড থাকে, যা রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়। এটি উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য একটি বড় সুবিধা, কারণ রক্ত জমাট বাঁধলে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

রক্তচাপের রোগীরা সরিষার তেল খাওয়ার সময় কী কী সতর্কতা মানবেন?

দৈনিক পরিমাণের সীমা মেনে চলা এবং খাঁটি তেল নির্বাচন করা আবশ্যক।

উপকারী হলেও মনে রাখতে হবে, সরিষার তেল কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি “তেল” বা চর্বি। তাই এটি ইচ্ছেমতো খাওয়া যাবে না। 

অতিরিক্ত তেল খেলে ওজন বাড়বে, যা উচ্চ রক্তচাপকে আরও বাড়িয়ে দেবে। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, একজন সুস্থ মানুষ বা রক্তচাপের রোগীর দিনে ১৫ থেকে ২০ মিলিলিটারের (৩-৪ চা চামচ) বেশি যেকোনো তেলই খাওয়া উচিত নয়।

রান্নায় ব্যবহারের সময় নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে পারেন:

১. পরিমিত ব্যবহার: তরকারিতে তেলের ভাসমান স্তর এড়িয়ে চলুন। কম তেলে রান্না করার অভ্যাস করুন।

২. ঘানি ভাঙা তেল: রাসায়নিকভাবে রিফাইন করা তেলের চেয়ে কোল্ড প্রেসড বা কাঠের ঘানিতে ভাঙা খাঁটি সরিষার তেল বেছে নিন।

৩. তেল পরিবর্তন করা: সবসময় শুধু এক ধরনের তেল না খেয়ে মাঝে মাঝে সরিষার তেলের পাশাপাশি সামান্য খাঁটি ঘি বা সূর্যমুখী তেল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করতে পারেন।

আপনার এলাকার বাজারে কিংবা অনলাইন শপগুলোতে বর্তমান সরিষার তেলের দাম কেমন, তা দেখে ভালো ব্র্যান্ডের বোতলজাত বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশ্বস্ত ঘানির তেল সংগ্রহ করার চেষ্টা করুন। সস্তা বা ভেজাল মিশ্রিত তেল হাই প্রেশারের রোগীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

খাঁটি সরিষার তেল চেনার সহজ উপায়

তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ, গাঢ় রঙ এবং ত্বকে ব্যবহারের পর আঠালো ভাব দেখে খাঁটি তেল চেনা যায়।

বাজারে অনেক সময় সস্তা তেলের সাথে কৃত্রিম রঙ এবং কেমিক্যাল মিশিয়ে সরিষার তেল হিসেবে বিক্রি করা হয়। ভেজাল তেল রক্তচাপের রোগীদের লিভার ও হার্টের বড় ক্ষতি করতে পারে। খাঁটি তেল চেনার ৩টি সহজ উপায় নিচে দেওয়া হলো:

  • গন্ধ ও ঝাঁঝ: খাঁটি সরিষার তেলের বোতল খুললেই একটি তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে আসবে। কেমিক্যালযুক্ত তেলে এই প্রাকৃতিক ঝাঁঝ থাকে না।
  • হাতের তালুতে পরীক্ষা: কয়েক ফোঁটা তেল হাতের তালুতে নিয়ে ঘষুন। যদি তেলটির রঙ উঠে যায় বা অন্য কোনো রাসায়নিক গন্ধ বের হয়, তবে বুঝবেন এতে ভেজাল আছে।
  • ফ্রিজিং টেস্ট: একটি ছোট পাত্রে কিছুটা তেল নিয়ে ফ্রিজে ৩-৪ ঘণ্টা রেখে দিন। যদি তেলটি পুরোপুরি জমে যায় বা নিচে সাদা স্তর পড়ে, তবে বুঝতে হবে এতে পাম অয়েল বা অন্য চর্বি মেশানো হয়েছে। খাঁটি সরিষার তেল ফ্রিজে জমে যায় না।

উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা অবশ্যই রান্নায় সরিষার তেল খেতে পারবেন, তবে তা হতে হবে পরিমিত এবং একদম খাঁটি। 

আপনার বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং প্রেসক্রিপশনের ওষুধের ওপর ভিত্তি করে রান্নায় তেলের সঠিক পরিমাণটি আপনার চিকিৎসকের কাছ থেকে একবার জেনে নেওয়া হবে সবচেয়ে উত্তম সিদ্ধান্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *